আ.লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের চাপ, নির্ভার বিএনপি

0
451

দলীয় নেতা খুনের মামলায় প্রায় দেড় বছর ধরে কারাবন্দী টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সরকারদলীয় সাংসদ আমানুর রহমান খান। আগামী নির্বাচনে আলোচিত-সমালোচিত এই সাংসদ দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন না, এমনটি ধরে নিয়ে নয়জন মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে নেমেছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় নেতা যেমন আছেন, তেমনি আছেন পেশাজীবীরাও।

এদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান। তাঁর বাইরে এবার দলীয় মনোনয়ন চেয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম। মনোনয়ন নিয়ে দুই নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও কোন্দল তেমন নেই। ফলে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি।

ঘাটাইল উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার ২ লাখ ৭২ হাজার ৫২৯ জন। ১৯৭০, ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ নির্বাচিত হন বর্তমান সাংসদ আমানুরের চাচা শামসুর রহমান খান। ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী শওকত ভূঁইয়া ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সাইদুর রহমান খান সাংসদ হন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে শামসুর রহমান খান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেও বিজয়ী হতে পারেননি। তাঁকে পরাজিত করে সাংসদ হন বিএনপির লুৎফর রহমান খান। তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ মতিউর রহমান। ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনে মনোনয়ন পান উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন আমানুর রহমান খান। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আমানুর।

২০১৪ সালের আগস্টে পুলিশের তদন্তে আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমেদ হত্যায় সাংসদ আমানুর এবং তাঁর ভাইদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে এলে তাঁরা আত্মগোপন করেন। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণের পর থেকেই কারাগারে আছেন সাংসদ আমানুর। মামলার বিচার শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর দাবি, কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে তাঁরা এমন সংকেতই পেয়েছেন যে আমানুর এবার মনোনয়ন পাচ্ছেন না। কারণ, নিজ দলের নেতা হত্যা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি সারা দেশে আলোচিত। এ অবস্থায় তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে দল সমালোচনায় পড়তে রাজি নয়।

আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য কামরুল হাসান খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দ আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ, আইনবিষয়ক সম্পাদক এস আকবর খান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শহীদুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ মতিউর রহমানের ছেলে তানভীর রহমান, সোনালী ব্যাংকের পরিচালক নুরুল আলম তালুকদার, তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক অধীর চন্দ্র সরকার ও ঘাটাইল জিবিজি কলেজের শিক্ষক ওয়াহেদ শরীফ সিদ্দিকী।

নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। দীর্ঘদিন থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থাও ভালো নয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন শহীদুল ইসলাম। সাংসদ আমানুর আত্মগোপনে যাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটি বিভিন্ন শাখার সম্মেলন করেছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দুই দফা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেন্দ্রের নির্দেশে তা স্থগিত রয়েছে। সাংসদ আমানুর কারাগারে থাকলেও তাঁর সমর্থকেরা এলাকায় এখনো সক্রিয়। আমানুরবিরোধীদের মধ্যে ঐক্য নেই বললেই চলে। কারও ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই।

এদিকে বসে নেই কারাবন্দী সাংসদ আমানুরের সমর্থকেরাও। আমানুরের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তাঁরা তৎপরতা চালাচ্ছেন। ফলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের শুধু বিরোধী দল নয়; মোকাবিলা করতে হচ্ছে আমানুরের সমর্থকদেরও।

শহীদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমানুরের কোনো জনসমর্থন নেই। দলকে তিনি গুছিয়ে রেখেছেন। আমানুরের সমর্থকেরা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন না। আশা করছেন আগামী নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাবেন ও বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন বলেন, তিনি তৃণমূলে ঘুরে ঘুরে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করছেন। মনোনয়নের ব্যাপারে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন।

মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, গণসংযোগকালে নেতা-কর্মীদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। এস আকবার খান বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তাই অন্য যেকোনো প্রার্থীর চেয়ে তিনি মনোনয়ন পেলে বিজয় সহজ হবে।

কামরুল হাসান খান বলেন, ‘২০০৩ সাল থেকে মাঠে জনগণের সঙ্গে কাজ করছি। এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ঘাটাইলের মানুষের আস্থা রয়েছে আমার ওপর। দল মনোনয়ন দিলে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে পারব।’

সাংসদ আমানুরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল ইসলাম হেস্টিং বলেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এখনো আমানুরের সমর্থক।

উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপিতে তেমন কোনো কোন্দল নেই। সাবেক সাংসদ লুৎফর রহমান খানের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে দলের সব পর্যায়ে। তিনি সাংসদ হওয়ার পর এ আসনে আর কেউ মনোনয়ন চাননি। তবে এবার মনোনয়ন চাইছেন জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মাইনুল ইসলাম। তিনি এলাকায় গণসংযোগ করছেন। মাইনুল ইসলামের দাবি, জেলা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব তাঁকেই সমর্থন করেছেন।

বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নেই দাবি করে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান বলেন, মন্ত্রী থাকাকালে ঘাটাইল উপজেলার রাস্তাঘাট, অবকাঠামোসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। ফলে জনগণ তাঁকেই সমর্থন করছে। বড় রাজনৈতিক দল, একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন চাইতে পারেন। তবে দলীয় মনোনয়ন লাভে তিনি আশাবাদী।

মাইনুল ইসলাম বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকে সমর্থন করেছেন। মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটে জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here