কার্ল মার্ক্সের ফিরে ফিরে আসা

0
192

১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কে মান্থলি রিভিউ পত্রিকার অফিসে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ সম্পাদক পল সুইজির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাদ যদি আর ১০০ বছর টিকে থাকে, তাহলে এই পৃথিবীর আর অস্তিত্ব থাকবে না।’ তারপর ২৫ বছর গেছে। এই সময়ে পুঁজির আগ্রাসনে বিশ্বের বাতাস, পানিসহ প্রাণপ্রকৃতি যেভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়েছে, যুদ্ধ আর বিষাক্ত অস্ত্রের বিস্তার যেভাবে ঘটেছে, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ, সহিংসতা, বৈষম্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে এভাবে চললে পৃথিবী ধ্বংস হতে ১০০ বছর লাগবে না। ¯এই সময়ে বিশ্বসংকটের বিভিন্ন পর্যায়ে মূলধারার মিডিয়া আর প্রভাবশালী বিদ্যায়তনেও বারবার কার্ল মার্ক্স এসেছেন সংকটের স্বরূপ অনুসন্ধানে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পর্যালোচনায়। বস্তুত পুঁজিবাদের প্রতিটি প্রকাশ্য সংকটকালে মার্ক্সের ডাক পড়ে, বন্ধু আর শত্রু উভয়ের কাছ থেকেই।

পুঁজি কি অ্যাডাম স্মিথ বা তাঁর অনুসারীদের ভাষ্যমতে, ‘অদৃশ্য হস্ত’ বা ‘মুক্তবাজার’ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়? হয় না। পুঁজির অতিসম্প্রসারণ, বিশ্বজুড়ে তার বিস্তার ও আধিপত্যের পেছনে থাকে বলপ্রয়োগকারী রাষ্ট্র। পুঁজি খেয়ে ফেলে পাহাড়, বন, নদী, সর্বজনের সম্পদ; পেছনে রাষ্ট্র না থাকলে তা সম্ভব নয়। পুঁজি সাম্রাজ্যবাদের রূপ ধারণ করে আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়ার দেশের পর দেশে গণহত্যা চালায়, তার সম্পদ দখল করে; পেছনে প্রবল রাষ্ট্র না থাকলে তা সম্ভব নয়। এই রাষ্ট্র মানে কী? এর মানে কেন্দ্রীভূত পুঁজির সঙ্গে কেন্দ্রীভূত ÿক্ষমতা, অস্ত্র, যুদ্ধ, আইন, দমন, পীড়ন ইত্যাদি। পুঁজিবাদ তাই যুদ্ধ, অস্ত্র, সন্ত্রাস, বলপ্রয়োগ ছাড়া চলতে পারে না। আবার মানুষ যাতে এগুলো বুঝেও না বোঝে, সে জন্য আছে সম্মতি উৎপাদনের বিশাল প্রচার বাহিনী। মানুষকে একদিকে অরক্ষিত, অন্যদিকে বোকা আর টাকা-পণ্য-উন্মাদ না বানিয়ে পুঁজিবাদ বিকশিত হতে পারে না। এই পুঁজিবাদ বিশ্লেষণ ও তার ভেতর ভবিষ্যৎ সমাজের সম্ভাবনা শনাক্ত করাই ছিল মার্ক্সের প্রধান কাজ।

মার্ক্সের দৃষ্টিতে পুঁজিবাদ হলো সব শোষণ-বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে গতিশীল, শক্তিধর, দ্রুত সম্প্রসারণমুখী। দর্শনে হেগেল, ফয়েরবাখ; অর্থশাস্ত্রে স্মিথ, রিকার্ডো, মিল, টমসন; সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় রবার্ট ওয়েন, সাঁ সিমোঁ, চার্লস ফুরিয়েসহ মানুষের পক্ষে-বিপক্ষে অসংখ্য চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কাজ পর্যালোচনা করেছেন মার্ক্স। খারিজ ও গ্রহণ দুটোই করেছেন একটি দার্শনিক অবস্থান থেকে। সেই দার্শনিক অবস্থান: অপমান, শোষণ, বঞ্চনা ও শৃঙ্খলের জীবন থেকে মানুষের মুক্তি। মার্ক্সকে খারিজ করতে গিয়ে বিকশিত হয় প্রান্তিকতাবাদী স্কুল। উইলিয়াম জেভনস, কার্ল মেনজার, ওয়ালরাসের কাজগুলো পুঁজির পক্ষে নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থিত করে, তৈরি হয় নয়া ক্ল্যাসিক্যাল স্কুল, যাকে আলফ্রেড মার্শাল আরও সংহত রূপ দেন। দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মার্ক্সকে মোকাবিলা করতে বহু তত্ত্বের জন্ম হয়। অন্যদিকে মার্ক্সকে নতুনভাবে পাঠ করতে দুনিয়াবদলের সংগ্রামকে সঠিক দিশা দিতেও তত্ত্বগত ক্ষেত্রে অনেক সমৃদ্ধ কাজ হতে থাকে।

মার্ক্সের ধারায় তাত্ত্বিক কাজের সঙ্গে অনিবার্যভাবে অবিচ্ছেদ্য থাকে জনপ্রতিরোধ ও বিপ্লবী লড়াইয়ের নানা ধাপ। বহু দেশে তাই বিপ্লব, বিপ্লবী আন্দোলন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, শ্রেণিলড়াই, নারীর মুক্তির লড়াই ধর্ম-বর্ণ-জাতিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই কার্ল মার্ক্স থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে, নিয়ে যাচ্ছে। সরদার ফজলুল করিমের ভাষায়, মার্ক্সের লেখা শেষ হয়নি। বিশ্বের মানুষের প্রতিটি মুক্তির লড়াইয়ে মার্ক্সের নতুন লেখা যোগ হয়।

মার্ক্সকে ইউরোপকেন্দ্রিক, কাঠামোবদ্ধ চিন্তাবিদ হিসেবে সমালোচনা করেন কেউ কেউ। মার্ক্স-পরবর্তী মুক্তির চিন্তা ও লড়াইয়ের ভেতর মার্ক্সের পুনঃপুন অভ্যুদয় এসব সমালোচনার অন্তর্নিহিত ভ্রান্তি স্পষ্ট করে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বহু দেশে মার্ক্স তাদের মতো করে হাজির হয়েছেন, হাজির করা গেছে। তাই ভেনেজুয়েলার কারাকাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের লেখক-শিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সভায় দেখেছিলাম বুশের যুদ্ধ-হুংকারের জবাবে হুগো চাভেজ বলছেন, ‘আমার হাতেও তোমাদের ধ্বংস করার মতো বড় দুটো বোমা আছে।’ তিনি দেখালেন এক হাতে মার্ক্সের ক্যাপিটাল, আরেক হাতে সিমন বলিভারের বই।

নতুন নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে, নতুন নতুন স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে মানুষই নতুন চিন্তা ও বিশ্লেষণ যোগ করে। জীবদ্দশায় মার্ক্স দেখেছিলেন পারি কমিউনের (১৮৭১) অসম্ভব সাহসী বিপ্লবী অভ্যুত্থান ও তার ওপর বর্বর গণহত্যার অধ্যায়। দমন-পীড়ন দিয়ে মানুষকে থামানো যায় না। তার প্রমাণ আগে ও পরে অসংখ্য। রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিশ্বে নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগঠিত চেষ্টা শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনের বাস্তব অবস্থা, সমস্যার ধরন এক রকম নয়, এক রকম নয় জনগণের চিন্তা সংহতি সংগঠনের অবস্থান। মার্ক্সও তাই নতুন নতুনভাবে পঠিত, গৃহীত ও উপস্থাপিত হতে থাকেন। পর্যালোচনা ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে করণীয় নির্দিষ্ট হয়। সে জন্য রুশ বিপ্লবের মতো চীন বিপ্লব হয়নি, চীন বিপ্লবের মতো কিউবা বিপ্লব হয়নি, কিউবা বিপ্লবের মতো ভিয়েতনাম বিপ্লব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও রাশিয়া-চীনের অনুকরণ করে কাজ হবে না।

নারীর মুক্তির লড়াই মার্ক্সীয় চিন্তার জগতে খুব গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে, তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমাদের এই অঞ্চলে বিশ শতকেই আলো জ্বেলেছিলেন বেগম রোকেয়া। তাঁর সঙ্গে মার্ক্সের যোগাযোগের কথা জানি না, কিন্তু তাঁর কাজ সেই ধারাকেই শক্তিশালী করেছে। প্রায় একই সময়কালে ইউরোপে ক্লারা জেটকিন, আলেকজান্দ্রা কোলন্তাই তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী সংগঠকের ভূমিকা পালন করে বিপ্লবী আন্দোলনের ত্রুটি দূর করতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। পরে আরও কাজ করেছেন সিমোঁ দ্য বুভোয়া, লিডিয়া সার্জেন্ট, জিলাহ আইজেনস্টাইন, হেইডি হার্টম্যান, শিলা রেবোথাম, অ্যাঞ্জেলা ডেভিস, সোনিয়া ক্রুকসসহ বহু দেশে বহু নারীবাদী তাত্ত্বিক।

প্রাণ ও প্রতিবেশের বিনাশ সাধন করে পৃথিবীর অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন প্রকৃতি ও মানুষের ঐক্য সন্ধানেও নতুনভাবে মার্ক্স হাজির হচ্ছেন, মার্ক্সীয় বিশ্লেষণ তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে এখন অনেক কাজ হচ্ছে, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জন বেলেমি ফস্টারের নাম। পুঁজি যত আগ্রাসী, যত স্বৈরতন্ত্রী বিশ্বব্যবস্থার চাপ তৈরি করছে, ততই বারবার ফিরে আসতে হচ্ছে মার্ক্সের কাছে, তাঁর বিশ্লেষণ পদ্ধতির কাছে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আইজাজ আহমদ ‘মার্ক্সের তিন প্রত্যাবর্তন: দেরিদা, ঝিঝেক ও বাদিউ’ শিরোনামের লেখায় এই ফিরে আসার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন (বাংলা অনুবাদ দেখুন: সর্বজনকথা, মে-জুলাই ২০১৮)।

মানুষের অন্তর্গত প্রবণতা হলো তার সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা। এ জন্য তার দরকার হয় স্বপ্ন, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণক্ষমতা, সাহস, ঔদ্ধত্য, সংহতি। এগুলো দিয়েই মানুষ বর্তমানে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা অতিক্রম করে। সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই মানুষের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। মার্ক্স উন্মুক্ত বলেই এই যাত্রায় তাঁকে পর্যালোচনা ও নতুনভাবে গ্রহণের সুযোগ ও গুরুত্ব সব সময়ই অনেক।

মার্ক্সের মতো পরীক্ষা আর কোনো তাত্ত্বিককে দিতে হয় না। অসংখ্য লেখা তৈরি করা হয়েছে তাঁকে খারিজ করতে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণায় নিয়োজিত আছে পুঁজিপন্থী বহু ÿক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান, তাঁর সমাধি রচিত হয়েছে বহুবার। কুৎসা, অপপ্রচার, ভুল সমালোচনার অসংখ্য তিরে বিদ্ধ হয়েও মার্ক্সের পুনর্জন্ম হয়েছে বারবার। হয়েছে পুঁজির সংকটের মুখে, নতুন কালের তাত্ত্বিকদের মাধ্যমে, জনগণের মুক্তির নানামুখী লড়াইয়ের মধ্যে। মার্ক ব্লগের ভাষায়, ‘মার্ক্স বারবার মূল্যায়িত হয়েছেন, সংশোধিত হয়েছেন, তাঁকে খণ্ডন করে কবর দেওয়া হয়েছে হাজারোবার, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস থেকে তাঁকে খারিজ করা যায়নি।’
হাজারবার কবর দেওয়ার পরও মার্ক্স ফিরে ফিরে আসেন, অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। কেন? কারণ একটাই-মানুষের মুক্তির চিন্তা ও লড়াই অপ্রতিরোধ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here