বাংলাদেশের সরকারি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্যভান্ডারে ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে অস্তিত্বহীন দম্পতি ও শিশুদের নামে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা হচ্ছে—শুধু নির্ধারিত লক্ষ্য (টার্গেট) পূরণের জন্য।
এই জালিয়াতির একটি চরম উদাহরণ রোমান আহমেদ ও মোসাম্মত মৌসুমি ইসলাম নামের এক তথাকথিত দম্পতি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯ বছর বয়সী রোমান ও ১৮ বছর বয়সী মৌসুমির নাকি ১৯টি সন্তান। সর্বশেষ সন্তান সাচ্চু জারিফের জন্ম দেখানো হয়েছে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর। অথচ অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দম্পতির অস্তিত্বই নেই। রোমান আহমেদ নামে বাস্তবে একজন যুবক থাকলেও তাঁকে ব্যবহার করে ইউপি কার্যালয় থেকে কাল্পনিক স্ত্রী ও সন্তান তৈরি করা হয়েছে।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ডেটাবেজে দেখা যায়, একই দিনে একাধিক সন্তানের জন্ম, জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু, এমনকি বাবা–মায়ের মৃত্যুর পরও সন্তানের জন্ম দেখানো হয়েছে। তিন শিশুর মৃত্যুর কারণ দেখানো হয়েছে ‘কার্ডিওজেনিক শক’। এসব তথ্য সম্পূর্ণ ভুয়া।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের লক্ষ্যপূরণের জন্য চাপ থাকে। লক্ষ্য পূরণ হলে পুরস্কার ও স্বীকৃতি মেলে, আর ব্যর্থ হলে তিরস্কার ও বদলির হুমকি আসে। এই চাপের কারণেই অনেক ইউপি সচিব ও সংশ্লিষ্টরা ভুয়া নিবন্ধনের আশ্রয় নিচ্ছেন—এমনটি স্বীকারও করেছেন একাধিক ইউপি সচিব।
শুধু রোমান-মৌসুমি নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর, কসবা ও আশুগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নে শত শত ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে। শিশুদের ক্ষেত্রেই জালিয়াতির হার বেশি। কারণ, জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে কোনো ফি লাগে না। ফলে কাগজে জন্ম দেখিয়ে দ্রুত মৃত্যুর তথ্য যুক্ত করা হচ্ছে।
তালিকায় পাওয়া গেছে আজব সব নাম—বেল পরী, পানি পরী, পায়েল পরী, এমনকি মোহাম্মদ মুকেশ আম্বানিও। কোথাও একই বাবা–মায়ের নামে কয়েক দিনের ব্যবধানে ‘যমজ’ সন্তান জন্ম ও মৃত্যু দেখানো হয়েছে। আবার একই নারীকে একাধিক পুরুষের স্ত্রী হিসেবে দেখিয়ে সন্তান জন্মের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ভুয়া তথ্য সরকারি পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এতে সিস্টেম দূষিত হচ্ছে, ভুয়া জনসংখ্যার তথ্য ঢুকে পড়ছে এবং অপরাধীরা এই তথ্য অপব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি চক্র বছরের পর বছর ধরে জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে ওঠা জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের জাতীয় তথ্যভান্ডার এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ভুয়া তথ্যের কারণে নাগরিক পরিচয়, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
Jatio Khobor