google-site-verification=0gYvQ-GEf6xx7n9m8L4kBORRnazBWwqZSSilspQTR5w
ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘দ্য ব্যাটলিং বেগমস’: রাজনৈতিক বৈরিতা, নিপীড়ন ও খালেদা জিয়ার বেদনাময় অধ্যায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Dec 30, 2025 ইং
‘দ্য ব্যাটলিং বেগমস’: রাজনৈতিক বৈরিতা, নিপীড়ন ও খালেদা জিয়ার বেদনাময় অধ্যায় ছবির ক্যাপশন: ‘দ্য ব্যাটলিং বেগমস’: রাজনৈতিক বৈরিতা, নিপীড়ন ও খালেদা জিয়ার বেদনাময় অধ্যায়
ad728

একজন স্বামীকে হারিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন খালেদা জিয়া, আরেকজন বাবাকে হারিয়ে রাজনীতির হাল ধরেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতির জটিল অঙ্গনে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু থেকেই ছিল তীব্র। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপ নেয় বৈরিতায়, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘দ্য ব্যাটলিং বেগমস’ শিরোনামে আলোচিত হয়। তবে ২০০৮ সালের পর এই বৈরিতা নতুন মাত্রা পায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময় থেকে খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার আচরণ রাজনৈতিক বিরোধিতা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নেয়।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে দীর্ঘ দেড় দশকের নিপীড়নের অবসান ঘটে খালেদা জিয়ার জীবনে। মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে তিনি আর রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি। ৭৯ বছরের জীবন শেষে আজ মঙ্গলবার চিরবিদায় নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার শাসনামলে কারা নির্যাতন ও অবহেলাই তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হলেও শুরুতে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। অন্যদিকে, ১৯৮১ সালেই দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন শেখ হাসিনা। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দুজনই রাজপথে নামেন, গৃহবন্দী হন এবং নিপীড়নের শিকার হন। তবে লড়াইয়ের লক্ষ্য এক হলেও তাঁদের এক কাতারে দেখা গেছে খুব কমই।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ভেঙে দিয়ে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদলই ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আওয়ামী লীগের মতে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত হন। সেই ঘটনার দায় তৎকালীন বিএনপি সরকারের ওপর চাপিয়ে আওয়ামী লীগ।

সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকার সেনানিবাসের ৬ শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়, যা বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি। সরকার এটিকে আইনি সিদ্ধান্ত বললেও বিরোধী পক্ষ একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে তাঁকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে এসে সেদিন অশ্রুসজল খালেদা জিয়ার দৃশ্য দেশবাসীকে নাড়া দেয়।

অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ক্ষোভই এই উচ্ছেদের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। শেখ হাসিনা একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, খালেদা জিয়া সেনানিবাসের বাসায় বসে ষড়যন্ত্র করতেন। উচ্ছেদের পর বাড়িটি ভেঙে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের জন্য আবাসন করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে খালেদা জিয়া আর ওই বাড়ি ফিরে না পান—এমন ধারণাও প্রচলিত।

কারাবাস ও বিচারপ্রক্রিয়া

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত সক্রিয় করা হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাসহ একাধিক মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১৮ সালে কারাদণ্ডের পর তাঁকে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিত্যক্ত মহিলা ওয়ার্ডে একমাত্র বন্দী হিসেবে রাখা হয়। গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে।

২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও তিনি কার্যত গৃহবন্দী ছিলেন। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার অনুমতি বারবার চাওয়া হলেও সরকার তা দেয়নি। শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়, যা খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে মানবিকতার অভাবের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

বালুর ট্রাকে অবরুদ্ধ

২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির দিন গুলশানের বাসভবন ফিরোজার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তিনি বাসা থেকে বের হতে পারেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ক্ষমতার প্রকাশ ও বিরোধী নেত্রীকে অপমানের একটি দৃষ্টান্ত।

সেদিনের দৃশ্য অনেকের কাছে প্রতীক হয়ে আছে—খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, বরং রাষ্ট্রীয় চাপ ও নিপীড়নের শিকার এক নারী, যিনি সব বাধা সত্ত্বেও দৃঢ়তা হারাননি। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক তীব্র সংঘাতপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Jatio Khobor

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
যমুনার ভাঙনে বিলীন ৯ গ্রাম, দিশেহারা শাহজাদপুরের মানুষ

যমুনার ভাঙনে বিলীন ৯ গ্রাম, দিশেহারা শাহজাদপুরের মানুষ